fbpx
 

অন্ধ জীবন

শরীফুল হাসান

অন্ধ জীবন

ড্রইং রুমে মাথা নীচু করে যে লোকটা বসে আছে এই সকাল বেলায়, তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে জসীম। বৃদ্ধ মানুষটার মাথার চুল সব ধবধবে সাদা, গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে। কোনমতে সোফায় হেলান দিয়ে বসে আছে বৃদ্ধ। মাঝে মাঝে ডানে-বামে মাথা ঘোরাচ্ছে। কিছু শোনার চেষ্টা করছে যেন।

জসীম এগিয়ে গেল, বৃদ্ধের পাশে বসল।

‘আপনেই তো আমার বাপ, তাই না?’ জিজ্ঞেস করল জসীম।

বৃদ্ধ কিছু বলল না, মাথা নাড়াল। তবে সেই মাথা নাড়ানোতে খুব বেশি একটা উৎসাহ চোখে পড়ল না জসীমের। সে আরো কাছে গিয়ে বসল। লোকটার গায়ের গন্ধ নেয়ার চেষ্টা করল, কোন গন্ধ নেই। লোকটার চেহারা ফ্যাকাশে, কোন এক কালে ফর্সা ছিল, খাড়া নাক। দেখতে ভালো ছিল একসময় তাতে কোন সন্দেহ নেই। 

জসীমের বউ সালমা ড্রইং রুমে উঁকি দিয়েছিল একটু আগে, ওকে হাতের ইশারায় দূরে থাকতে বলেছে জসীম। ছেলে-মেয়ে দুটোও বারবার উঁকিঝুঁকি দিতে চাইছে। কিন্তু সালমাকে কঠিনভাবে বলা হয়েছে কোনভাবেই ওরা যেন ড্রইং রুমে না ঢোকে, অন্তত জসীম যতক্ষণ না বলে।

‘আপনে অনেক অনেক বছর পরে আসছেন, আপনের লগে আমার কিছু কথা আছে,’ জসীম বলল, ‘চা খাইবেন?’

বৃদ্ধ মাথা নাড়াল। সেটা হ্যাঁ-সূচক না না-সূচক তা বোঝার চেষ্টা করল না জসীম।

‘আমি আপনেরে একটা গল্প কই, মন দিয়া শুনবেন, এই গল্পের কয়েকটা ভাগ আছে, শুনবেন তো?’

বৃদ্ধ আবারও মাথা নাড়াল। এইবার মাথা নাড়ানোটা হ্যাঁ-সূচক তা বুঝতে অসুবিধা হলো না জসীমের।

‘গল্পটা আমি কয়েকটা ভাগে কমু। মন দিয়া শুনবেন। আমি অশিক্ষিত মানুষ, ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ছি কোনমতে, বুঝছেন তো?’ জসীম বলল, বৃদ্ধ মাথা নাড়াল না কি নাড়ালো না সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই।

‘আমার মা, মোসাম্মাৎ আনোয়ারা বেগম। তার জীবনের শুরুটাই খুব করুণ। বুঝলেন তো, এরমতো শুরু কারো জীবন যেন না হয়। আনোয়ারা বেগম যখন মায়ের পেট থেইক্যা বাইর হইলো, তহন সে দুনিয়ার আলো দেখল না। সে কানল, তার কান্দন শুইন্যা সবাই খুশি হইল। কিন্তু টের পাইল মাইয়া অন্ধ। মায়ের পেটের মইধ্যে থাইক্যাই অন্ধ। বুঝেন অবস্থা! এমনেই আনোয়ারা বেগমের মায়ের আরো তেরোটা সন্তান ছিল, এই অন্ধ মাইয়া নিয়া সে কী করবে। তার জামাই ছিল কামলা মানুষ। এই অন্ধ মাইয়া পালনের কোন ইচ্ছাই তার ছিল না। এই মাইয়ারে সে রাইতের অন্ধকারে রাইখ্যা আসল মিয়া বাড়ির সামনের বারিন্দায়। কালো একটা খেতা দিয়া মুড়াইয়া। সেই বারিন্দায় কুত্তা বিলাই থাকে। আনোয়ারারে সেই রাইতেই কুত্তা বিলাই খুবলাইয়া খাইতে পারতো। কিন্তু খায় নাই। কেন জানেন?’

সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল, হাঁটু গেড়ে বসল বৃদ্ধের সামনে। ‘খায় নাই, কারন আনোয়ারা বেগম মইরা গেলে এই জসীমের জন্ম হইতো না। সবই উপরআলার লীলাখেলা। যাই হোক, রাইতেই মিয়া বাড়ির বউ মাইয়ার কান্দনের আওয়াজ পাইয়া ওরে বাসায় নিয়া আসলেন। বাসার সবাই নানা রকম নিন্দামন্দ করতে থাকল। কারন কার না কার সন্তান ফালাইয়া গেছে। এই সন্তান যেন এতিম খানায় দিয়া দেয়। তারপরে মাইয়া আবার অন্ধ। কিন্তু মিয়া বাড়ির বউ লতিফা খাতুন বয়স্ক মানুষ, তেজি মানুষ। তার এক গোদা পোলাপান। সবগুলো বড় হইছে, দু’একজন বিয়া-শাদিও করছে। তিনি পণ করলেন এই মাইয়ারে বড় করবেন। তার স্বামী আলতাফ মিয়ার বয়স আরো বেশি, ব্যাটা তখন মৃত্যুশয্যায়। যাই হোক, আলতাফ মিয়া কিছুদিনের মইধ্যে মরলেন। লতিফা খাতুন আনোয়ারারে বড় করতে লাগলেন। অন্ধ মাইয়া, কিছুই দেখে না। তারে বড় করা সহজ কাজ না। তার বাকি পোলাপান আনোয়ারারে মাইনা নিছে, কিন্তু আপন হিসেবে না। তাগোর মায়ের একটা খেলনা হিসাবে। এমনিতে তাগোর ব্যবসা বাণিজ্য ভালোই ছিল। কিন্তু আলতাফ মিয়া মরার পরে ব্যবসা পইড়া গেছে। আনোয়ারার বয়স পাঁচ-ছয় পর্যন্ত ভালোই কাটছে। অন্ধ হইলেও তার মাথায় কিছু বুদ্ধিশুদ্ধি ছিল। ঐ আমলে তখনও অন্ধগর পড়ালেখার সুযোগ হয় নাই। লতিফা খাতুন নিজে টুকটাক পড়াইতেন, আরবী পড়াইতেন আর গল্প করতেন। এইসব করতে করতে আনোয়ারার বয়স যখন আট হইলো, তখন লতিফা খাতুন মরলেন। তিনি নিজে মরলেন, আর আনোয়ারারে মাইরা গেলেন। লতিফা খাতুন মরার পরে আনোয়ারার বিপদ হইলো। এমনেই ব্যবসা খারাপ, এরমধ্যে একটা বাড়তি মুখরে বাড়ির কেউই আর ভালো চোখে দেখতেছিল না। লতিফা খাতুনের পোলার বউদের শলাপরামর্শে আনোয়ারারে বাড়ির কাজে-কামে লাগানি হইল। অন্ধ মাইয়া চোখে দেখেনা, কিন্তু দুতলা বাড়ির আনাচে-কানাচে সে চিনে। উঠান চিনে। দেওয়ালে হাত দিয়া দিয়া সে সব জায়গায় যাইতে পারে, সিঁড়ি দিয়া দুতলায় উঠতে পারে। তারে দিয়ে মশলা বাঁটা, ঘর মুছা এইসব কাম করানি হইতেছিল। আনোয়ারা শুরুতে কানতো, তার মনে হইতো সে তো এই বাড়ির মাইয়া। তার সাথে এরকম করে কেন সবাই। লতিফা খাতুনের জন্য সারা দিন রাইত সে কানতো। কিন্তু কাইন্দ্যা লাভ কি! তার যা হবার তাই হইছে। লতিফা খাতুনের মরার সাথে সাথে সে এই বাড়ির মাইয়া থেইক্যা কাজের লোক হইয়া গেছে। তার থাকনের ব্যবস্থা হইলো দুতলার সিড়িঘরের নীচের খালি জায়গায়।থাকনেও লগে তিনবেলা ভাত। এই হইলো ব্যবস্থা।’

জসীম একটা সিগারেট ধরাল। বাবার সামনে সিগারেট ধরাতে তার কোন অস্বস্তি হলো না। বড় করে একটা টান দিয়ে শুরু করল আবার, ‘এমনে এমনে আনোয়ারা বেগম মিয়া বাড়িতে বড় হইতে থাকল। মশলা বাঁটা, ঘর মুছা, আর উঠান থাইক্যা কলসী কইরা পানি তুলতো দুই তলায়, সেইখানে একটা ড্রামে পানি রাখতো। এই ছিল তার কাজ। তার বয়স যখন সতেরো হইল, মিয়া বাড়ির বড় পুলা, হামিদ মিয়ার দুকানে কাম করতে আইলো এক ছোঁড়া। ছোড়ার নাম রহমান। দেখতে শুনতে ভালাই। সে এই অন্ধ মাইয়া, আনোয়ারার প্রেমে পইড়া গেল। আনোয়ারা দেখতে কালো হইলে কি হইবো, তার দুই চোখে ঘোলা হইলে কি হইবো, তার চেহারা ছিল সুন্দর, হাসিটা ছিল সুন্দর আর মনডা ছিল আরো সুন্দর। রহমান দুকানের কাম কইরা মিয়া বাড়িতে আসে আনোয়ারারে দেখার লাইগা। বাড়ির সবাই টের পাইল। আনোয়ারা কাজেই লোক হইয়া গেলেও, তার উপরে সবার খুব মায়া ছিল। তারা রহমানের সাথে আনোয়ারার বিয়া দিয়া দিল। আহা, সে কী বিয়া! অন্ধ মাইয়ারে বিয়া। ব্যাটার মতো একটা কাম করলো রহমান। অন্ধ মাইয়ারে বিয়া কইরা ফেলাইলো। তাও কোন যৌতুক পাইলো না, কিছুই পাইলো না। ভালোবাইস্যাই সে এই কাম করলো। মিয়া বাড়ির উঠানের এক কুনায় দুইজনরে একটা ঘর তুইল্যা দেয়া হইলো। সেইখানেই তারা থাকতে থাকল। কি বুঝলেন, গল্পটা কেমন জমছে?’

সিগারেটের ছাই ফেলার কথা মনে ছিল না। ছাই গিয়ে পড়েছে নীচের কার্পেটে। সালমা দেখলে খুব হৈচৈ করবে। পা দিয়ে ছাইটা পিষে ফেলল জসীম।

‘তারপরের ঘটনা শুনেন। রহমান তো বিয়া করছে, খুব ভালোই দিন কাটতেছে। সকালে রহমান হামিদ মিয়ার দুকানে গিয়া বসে, দুপুরে খাইতে আসে। আনোয়ারা খাওন দেয়। সে রানতে পারে না। দুতলা থেইকা রাইন্ধ্যা দেয় হামিদ মিয়ার বউ। যাই হোক, খাওয়া দাওয়া শেষে রহমান আবার দুকানে যায়। আনোয়ারা নিজের মতো পুরা বাড়ির কাম কাজ করে আগের মতোই। সেই মশলা বাঁটা, ঘর মুছা, পানি তোলা এইসব। সন্ধ্যার পরে আনোয়ারা নিজের ঘরে বইসা রহমানের জন্য অপেক্ষা করে। রহমান অনেক রাইত কইরা আসে। দুই মাস যাইতে না যাইতেই আনোয়ারা বুঝে রহমান বদলাইতেছে। এখন আর আগের মতো তারে ভালোবাসে না। সে কিছু দেখে না, এইটা একসাথে থাকতে গিয়ে পদে পদে টের পায় রহমান। তাতে রহমান বিরক্ত হয়, বুঝে আনোয়ারা। কিন্তু দুনিয়ার আর সব কিছু ঠিক করতে পারলে চোখ ঠিক করনের সাইধ্য তার নাই। এইজন্য সে চুপ থাকে। জামাই দু’একটা কথা কয়, রাগ করে, সে কিছু কয় না। এরমধ্যে ভালো খবর আসে। জানা যায় আনোয়ারা বেগমের সন্তান হবে। এইটা শুইনা রহমান আরো রাইগা যায়। আনোয়ারা মনে করছিল সন্তান হইবো শুইনা রহমান খুব খুশি হইবো। হইলো উলটা। রহমান কইতে শুরু করল আনোয়ারার সন্তানও অন্ধ হইবো। সে আর এইসব অন্ধটন্ধের লগে নাই। আনোয়ারা যেন সন্তান নষ্ট করে। আনোয়ারা তো জীবনেও সেইটা করবো না। এইজন্য যা হওনের তাই হইলো। রহমান আনোয়ারারে একলা রাইখ্যা, হামিদ মিয়ার দুকানের কিছু ক্যাশ টেকা লইয়া ভাগল। এমন ভাগা ভাগলো যে হামিদ মিয়া অনেক চেষ্টা কইরাও তার কোন খবর করতে পারলো না। আনোয়ারা যথাসময়ে সন্তানের জন্ম দিল। এক পোলা হইল। পোলা অন্ধ হইলো না। পোলার চোখ হইলো বড় বড়। সেইটা দেইখ্যা পুরা মিয়া বাড়ি খুশি হইল।

‘আনোয়ারার হইল বিপদ। সে নিজে অন্ধ। এরমধ্যে একটা পোলা সে ক্যামনে মানুষ করে। কিন্তু ঐযে মা তো। ঠিকই পোলারে বড় করতে থাকল। সে যখন মশলা বাঁটে পুলারে কাছে বসাইয়া রাখে, সে যখন ঘর মুছে পুলারে বিছানায় বসায়। পুলায় একটু লড়লেই সে টের পায়। তার কান সেইরকম খাড়া। এরমধ্যে একদিন পুলা খাট থেইক্যা পইড়া গেল। সেইদিন নাকি আনোয়ারা আছড়াইয়া বিছড়াইয়া কানছে। কিন্তু পুলার কুন ক্ষতি হয় নাই। এরপর থেইক্যা পুলারে সে কাছ ছাড়া করে না। যা করে পুলারে কোলে নিয়া করে। মশলা বাঁটে, ঘর মুছে, পানি তুলে। এক হাতে মশলা বাঁটে আরেক হাতে পুলা থাকে, এক হাতে ঘর মুছে, আরেক হাতে পুলা থাকে, এক হাতে কলসী থাকে, আরেক হাতে পুলা থাকে। বুঝছেন তো অবস্থাডা? যাই হোক, পুলা আস্তে আস্তে বড় হইতে থাকল। মিয়া বাড়ির পোলাপাইন সব স্কুলে যায়। পুলারেও স্কুলে ভর্তি করাইয়া দেয়া হইল। পুলা নিজে হাইটা স্কুলে যায়, বাসায় আইসা বিছানায় বইসা পড়ে। এমনে এমনে পুলাটা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ল। কিন্তু মিয়া বাড়ির লোক চিন্তা করল, আনোয়ারার পুলার পেছনে খরচ করার দরকার নাই। ওরে দুকানে বসাইয়া দিল তারা। আনোয়ারা সেইদিনও খুব কানছিল। কিন্তু তার তো সাধ্য ছিল না। সে নিজেই আশ্রিত মিয়া বাড়িতে, এই বাড়িতে তার ইচ্ছার কোন দাম নাই। আনোয়ারার পুলা দুকানে গিয়া বসল। হামিদ মিয়া আর তার বাকি ভাইগর লগে কামে লাগল। সে জিনিসপত্র আগাইয়া দেয়। এইটা সেইটা করে। এইগুলা করতে করতে পুলা বড় হইতে থাকল। আনোয়ারা বুড়া হইতে থাকল। মা এতো ভারি ভারি কাম করে, এইগুলা পুলার কাছে ভাল লাগতো না। সে খালি চিন্তা করতো একদিন সে বড় হইয়া নিজে ব্যবসা করবো, মা’রে আর কাম করতে হইবো না। আনোয়ারার পুলা বড় হইলো আরও। তার যখন বিশ বছর তখন আনোয়ারার বয়স চল্লিশের মতো। শরীর পইড়া গেছে, আগের মতো কাজ করতে পারে না। তারপরেও কাম করে, কিছু করার নাই। আনোয়ারার পুলা তখন এক কাম করলো, সে হামিদ মিয়ার দুকানে কাম করার সাথে সাথে টুকিটাকি কিছু ব্যবসা শুরু করল। তার জীবনে তখন একটাই চাওয়া, মা’রে শান্তি দেয়া। সে দিনরাইত খাটাখাটনি করতে থাকল। এই করতে করতে পুলার বয়স ত্রিশ হইল। একটু একটু ব্যবসা কইরা কিছু টেকা জমাইছে। সে তখন মা’রে নিয়া আলাদা বাসা নিবে, এমন অবস্থা। এরমধ্যে কি হইলো জানেন?’

বৃদ্ধ মাথা নাড়াল না।

জসীম আবার বৃদ্ধের হাঁটুর কাছে গিয়ে বসল।

‘আনোয়ারা বেগম মইরা গেল। সেই রাতে ঘুমের মইধ্যে আনোয়ারা মইরা গেল। মরার সময় আনোয়ারা কি তার পুলারে ডাকছিল? সেইটা তার পুলা জানে না। তার মা কি একগ্লাস পানি খাইবার চাইছিল? সেইটাও জানে না। পুলা তখন ছিল ঢাকায়, বড় একটা ব্যবসা ধরতে গেছে। তখন মোবাইল ছিল না, কিছু ছিল না। পুলারে খবর দেওনের কোন ব্যবস্থা নাই। মিয়া বাড়ির লোকজন আনোয়ারার জানাজা পড়াইলো, দাফন করাইলো। পুলা বাড়ি ফিরল তিনদিন পরে। সে মিয়া বাড়িতে পা রাখনের লগে লগে কান্দনের রোল উঠল। পুলা আর কিছু কইল না। তার কপালে ছিল না মা’রে শেষবারের মতো দেখে, মা’রে নিয়া আলাদা কইরা থাকে, মা’রে একটু শান্তি দেয়। তার মা সারাজীবন কষ্ট করছে, মইরাই মনে হয় আনোয়ারার শান্তি হইলো।

আনোয়ারার পুলা মিয়া বাড়ি থেইক্যা বাইর হইয়া আসল। তার নিজের ব্যবসা দাড়াইলো। সে বিয়া করল। সে পড়ালেখা জানে না, কিন্তু ব্যবসা জানে। তার ব্যবসা ফুইলা গেল। মিয়া বাড়ির হামিদ মিয়ার পোলাপাইন তার কাছে টেকা ধার চাইতে আসে। সে দেয়। একসময় এরা তারে অপমান অপদস্থ করছে। কিন্তু মায়ের কাছে সে লতিফা খাতুনের কথা শুনছে। লতিফা খাতুনের জন্যই তার মা বাইচা ছিল, সে আছে। তাই মিয়া বাড়ির ঋণ তার জীবনে আছে। সে মিয়া বাড়ির সব কিছুতে থাকে আর যখন সিঁড়ির নীচের মা-এর ঐ থাকার জায়গাটা চোখে পড়ে, তখন সে কান্দে। আমি জসীম, আনোয়ারার পুলা। আমি জীবনে অনেক কিছু পাইছি, অনেক টেকা কামাইছি, কিন্তু আমার মা’র জইন্য কিছু করতে পারি নাই।’

বলে হাউমাউ করে কাঁদতে থাকল জসীম। তার কান্না শুনে ড্রইং রুমে ঢুকতে যাচ্ছিল সালমা, তার দুই সন্তান। কিন্তু হাতের ইশারায় ওদের যেতে বলল জসীম।

‘আপনে রহমান। আইজ আমার কাছে আসছেন। আপনে চাইছিলেন আমারে যেন মা নষ্ট কইরা ফেলে, আমি নাকি অন্ধ হমু। আল্লাহর মাইর দেখেন, আমি অন্ধ হইনাই। আমার এখন অনেক টেকা। আপনি যদি আমার মা’র লগে থাকতেন আমার মা’র জীবনডা কতো ভালো হইতো। কিন্তু আপনে তারে ভালোবাসতে পারেন নাই, তারে ছাইড়া ঢাকায় গেছেন। নতুন কইরা বিয়া করছেন। সংসার পাতছেন। পাঁচ সন্তান আপনের। আইজ এতোদিন পরে আসছেন আমার এইখানে। আপনের এক পোলা আপনেরে আমার এইখানে দিয়া গেছে, আপনের কী মনে হয় সে আসবে আর?’

‘করিম আসবে না?’ বৃদ্ধ বলল বিড়বিড় করে।

‘না। তার যে মোবাইল নাম্বার দিয়া গেছে, সেইটা বন্ধ। আপনেরে ড্রইং রুমে বসাইয়া বলল একটু নীচে যাইতেছে, ফিরা আসবো এক ঘন্টার মদ্ধে। আসে নাই। আসবেও না।’

‘বাবা, জসীম। আমারে মাফ কইরা দেও। আর আমারে ঢাকায় পাঠানের ব্যবস্থা করো। আমার পোলা মনে হয় বাসার ঠিকানা ভুইলা গেছে, চিনতে পারতেছে না।’

জসীম হাসল। ঘর কাঁপিয়ে, যেন কোন মজার কথা শুনছে।

‘বাবা, অন্ধ হইছেন। এখন টের পাইবেন জীবন কেমন! আপনের ঐ পোলা আর কোনদিন আইবো না আপনেরে নিতে। আপনের থাকার ব্যবস্থা করছি আমি। জিজ্ঞাস করেন কুথায় ব্যবস্থা করছি?’

বৃদ্ধ কিছু জিজ্ঞেস করল না। ছানি পড়া দৃষ্টিহীন চোখে তাকাল জসীমের দিকে।

‘সিঁড়ির তলে। যেইখানে একসময় আমার মা থাকতেন।’

Shariful Hasan
sharif.h.lashkar@gmail.com
No Comments

Post A Comment

Shopping cart0
There are no products in the cart!
Continue shopping
0