fbpx
 

এক হেঁয়ালিমাখা সন্ধ্যার গল্প

শরীফুল হাসান

এক হেঁয়ালিমাখা সন্ধ্যার গল্প

কুয়াশা ঘেরা এক সন্ধ্যা। রেলস্টেশনে তেমন ভীড় নেই। প্ল্যাটফর্ম প্রায় ফাঁকা। রতন একটা

চায়ের দোকানে একা বসে আছে। সিগারেট টানছে। এরমধ্যে প্রৌঢ় এক ভদ্রলোক এসে দাঁড়াল তার পাশে।

‘আগুন দেয়া যাবে?’ জিজ্ঞেস করল লোকটা।

ভদ্রলোকের হাত একটা সিগারেট। রতন শার্টের পকেট থেকে একটা দেয়াশলাই বের করে এগিয়ে দিল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে খুব টেনশনে আছে। দেয়াশলাই দিতে গিয়ে সেটা হাত থেকে পড়ে গেল। কোনমতে সেটা ভদ্রলোকের হাতে দিল। অস্থিরভাবে সিগারেটে টান দিচ্ছে রতন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক পাশে বসে সিগারেট ধরালো।

‘কোন সমস্যা?’ আবারও প্রশ্ন করল লোকটা।

রতন তাকাল একঝলক। ভদ্রলোকের মুখ কাঁচাপাকা দাঁড়িতে প্রায় ঢেকে আছে। বিরক্ত হলেও কিছু বলল না। এমনিতেই টেনশনের সময় বাড়তি কথা তার ভালো লাগে না।

‘আমাকে খুলে বলতে পারো? তোমাদের মতো বয়স তো আমরাও পার করেছি।’

‘খুব ঝামেলায় আছি। বিরক্ত করবেন না প্লিজ।’ যতোটা সম্ভব ভদ্রভাবে বলল রতন, সিগারেটটা আড়াল করল, হাজার হোক বয়সে লোকটা অনেক বড়।

‘ঐ জিনিস আর লুকিয়ে কি হবে? আসলে আমার হাতে ঘন্টাখানেক সময় আছে। ট্রেন লেটে আসবে। তোমার ভাবি ছেলেমেয়েদের সাথে মোবাইলে কথা বলছে। এ কথাও সহজে থামবে না। এই সময়টা আমি তোমার সাথে গল্প করতে পারি।’

‘মোবাইল! সে আবার কি? যাক গে, আমার ঝামেলা কি শুনবেন?’

‘শুনবো। সব খুলে বলো।’

রতন দূরে সালোয়ার-কামিজ পরা একটা মেয়েকে দেখাল। ওড়নায় মেয়েটার মুখ ঢাকা। সাথে সুটকেস। প্রৌঢ় ভদ্রলোক হাত ইশারায় ডান দিকে এক ভদ্রমহিলাকে দেখাল। দূর থেকে চেহারা দেখা যাচ্ছে না। তবে মনে হচ্ছে কারো সাথে কথা বলছে।

‘ঐ মেয়েটাকে সাথে নিয়ে পালাবো। কিন্তু…’ রতন বলতে গিয়েও থেমে গেল।

‘কিন্তু কি?’

‘একটা গন্ডগোল হয়ে গেছে।’

‘কি গন্ডগোল?’

‘বুঝতে পারছি না কী করবো? কি বলবো?’

‘আমাকে ঘটনা বলো। হয়তো আমি সমাধান দিতে পারবো।’

‘ঘটনার শুরু ছয় মাস আগে। খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে।’

রতন বলতে শুরু করল।

‘আমি ইন্টারমিডিয়েটের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্র। সায়েন্স। মেট্রিকে ফার্স্ট ডিভিশন। চারটা লেটার। ইন্টারে ভর্তি হয়েই পাখা গজাল। সারাদিন সাইকেলে নিয়ে ঘুরি দুই বন্ধু। আমি আর শামীম। আমরা দুজনে ব্যাচে পড়া শুরু করলাম। ইংরেজি। স্যারের নাম প্রভাত কুমার। স্যার ব্যাচে দশজন করে পড়াতো। পাঁচজন ছেলে আর পাঁচজন মেয়ে। এরমধ্যে একটা মেয়েকে আমার ভাল লেগে গেল। মেয়েটার নাম সোমা। নুরুন্নাহার সোমা। মেয়েটা কম কথা বলে। ক্লাস শেষে দ্রুত বাড়ি চলে যায়। আমি আর শামীম সাইকেল নিয়ে নিরাপদ দূরত্বে পেছন পেছন যাই।’

‘অনেকটাই মিলে যায় আমার সাথে। তারপর…’ 

‘তারপর কি? সাইকেলে করে মেয়েটার বাসার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকি। ঘন্টার পর ঘন্টা দুই বন্ধু গল্প করি। আমি চারতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকি। ঐ বাড়িতেই সোমা থাকে। এভাবেই চলতে থাকে সব। পড়া শেষে আমি আর শামীম সাইকেলে করে চলে আসি রাস্তার মোড়ে। তবে এখন আর সাথে সাথে বেরুই না। বাসা যেহেতু চেনাই আছে, তাই পরে আসি। বেশিরভাগই বিকেলের দিকে। মনে আশা যদি সোমাকে দেখা যায়, ছাদে কখনো। মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাই। লোকজন আমাদের দিকে আড়চোখে তাকায়। কেউ কেউ কড়া চোখে তাকায়। ছাদে সোমাকে দেখা যায়। হাঁটছে। সাথে ওর এক বান্ধবীও থাকে। এই মেয়েটাও আমাদের সাথে ব্যাচে পড়ে।’

‘তারপর কি হলো?’

‘সোমাকে কিভাবে মনের কথা জানাবো তা ভাবতে শুরু করলাম। হঠাৎ একদিন লক্ষ্য করলাম বারো তেরো বছরের একটা ছেলে বেরিয়ে আসছে চারতলা বিল্ডিংটা থেকে। ওকে আগেও দেখেছি। খুব চটপটে মনে হয়েছে। ওকে ডাকলাম। অনেক ডাকাডাকির পর ছেলেটা এলো। ওর নাম নান্টু। ঐ চারতলা বাড়িটায় থাকে। স্কুলে পড়ে। খুব পাকা ছেলে। ওকে একটা কাজ করতে দিলাম। অনেক কষ্টে রাজি করালাম, একটা টেনিস বলের প্রতিশ্রুতি দিয়ে। বাসায় ফিরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি, আর সোমার কথা ভাবি। পড়াশোনা সব শিকেয় উঠল। ঘুমও হয় না ঠিকমতো।’

‘এরকম হয়েছিল। তারপর বলো…’

‘সন্ধ্যার পর বাসা থেকে বেরুনো বারন। তবু চুপচাপ বেরিয়ে গেলাম, সাইকেল নিয়ে। শামীমের কাছে। ওর বাসা আমার বাসার কাছেই। ওকে বললাম আমাকে একটা বুদ্ধি দিতে। ও আমার সাথে হাসি-ঠাট্টা করলো। আর বলল আমি যেন সরাসরি যা বলার সোমাকে বলে দিই। তাহলেই হবে। কিন্তু আপনিই বলুন, ব্যাপারটা কি এতোই সোজা?’

‘অনেক কঠিন কাজ, তারপর বলো?’

‘এরপর আর কি, এভাবেই চলতে লাগল। আমরা একসাথে পড়ি, দেখা হয়। কিন্তু সোমা খুব একটা ফিরে তাকায় না। পড়া শেষে রিক্সায় করে বান্ধবী আর সে বাড়ি ফিরে যায়। আমিও যাই পিছু পিছু।’

‘এভাবে কতোদিন? আর সে নান্টু কোথায়?’

‘ওর জন্য টেনিস বল কেনা আছে, কিন্তু ওকেই তো পাই না। তারপর শোনেন কি হলো?’

‘বলো।’

‘একদিন আমি আর শামীম রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। এইসময় কিছু ছেলে এলো। ওরা এই এলাকার স্থানীয় ছেলেপুলে। আমাদের রীতিমতো শাসিয়ে গেল আর যেন এই মোড়ে না দাঁড়াই। আমি আর শামীম চলে এলাম।’

‘তুমি ভয় পেয়ে পালিয়ে গেলে?’

‘আসলে ভয় পাই নি। এরকম মাস্তানি নিজের এলাকায় সবাই করে। ওরাও করেছে। কিন্তু…’

‘কিন্তু কি?’

‘এরপর ঘটনাটা অন্যদিকে মোড় নিলো।’

‘কি রকম?’

‘এরপরের দিন আর ঐ এলাকায় যাইনি। পড়ার সময় সোমার সাথে দেখা হলো। আমি পড়া শেষে বাইরে এসে দাড়ালাম। ভাবলাম কিছু কথা বলবো। কিন্তু আমাকে যেন দেখতেই পেল না মেয়েটা। আমি ডাকার চেষ্টা করলাম। গলা থেকে কোন আওয়াজ বের হলো না। শামীম খুব হাসল পাশে দাঁড়িয়ে, খুব লজ্জা পেলাম। সন্ধ্যায় নিজের টেবিলে বসে বড় করে একটা চিঠি লিখলাম। চিঠিটা হাতে নিয়ে ভাবলাম ছিড়ে ফেলবো। তারপর বুদ্ধি এলো। পরেরদিন সাইকেল নিয়ে গেলাম ঐ মোড়ে। আমি একা। নান্টুকে দেখলাম ঐ বাড়িটা থেকে বেরিয়ে আসছে। ওকে হাত ইশারায় ডাকলাম। নান্টু এলো। ওকে টেনিস বল দিলাম। ছেলেটা খুশি হয়ে গেল। ওকে গতকাল লেখা চিঠিটা ধরিয়ে দিলাম। বললাম সোমাকে দিতে। ও বলল ওর সোমাদিকে দিয়ে দেবে। এরমধ্যে দূরে ঐ ছেলেগুলোকে দেখে আমি দ্রুত চলে এলাম।

‘আহ! হাতে লেখা চিঠি! কি অদ্ভুত!’

‘অদ্ভুতের কি আছে? চিঠি ছাড়া কিভাবে মনের কথা জানাবো।’

‘তাই তো বলছি।’

‘আপনি মাঝে মাঝে অদ্ভুত কথা বলেন।’

‘হয়তো তাই। তারপর কি হলো, বলো? তোমার গল্পের সাথে আমার নিজের অনেক মিল দেখতে পাচ্ছি।’

‘একটু কারেকশন আছে। আমারটা গল্প না। সত্যি ঘটনা।’

‘তুমি ঠিক তেমনই আছো, যেমনটা ছিলে।’

‘আবার অদ্ভুত কথা।’

‘আচ্ছা, আর বলবো না। এবার বলো?’

‘চিঠি পাঠিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরলাম। অস্থির লাগছিল। সোমা চিঠি পেয়েছে কি না জানি না। চিঠি পড়েছে না ছিড়ে ফেলেছে? সেটাও জানি না। এরপরের দিন পড়তে গিয়ে দেখলাম সোমা আসে নি। খুব খারাপ লাগছিল। শামীমকে বললাম আমার সাথে যেতে। শামীম ঐ এলাকায় যেতে রাজি হলো না। বুঝলাম শামীম ঐদিনের হুমকিতে ভয় পেয়েছে। আমি একা একাই চলে এলাম ঐ বাসার মোড়ে।’

‘তোমার খুব সাহস, তাই না?’

‘সাহসের তো কিছু দেখেনই নি, তবে এরপর যা ঘটল সেটা আসলে আমার ধারনার বাইরে।’

‘আমারও একসময় খুব সাহস ছিল বুঝলে। কলজে ভরা সাহস। যাক, তারপর কি ঘটল!’

‘আমি খুব মার খেলাম। ঐ পাড়ার ছেলেগুলো আমাকে একা পেয়ে বেশ মারল। চোখের নীচে কালশিটে পড়ে গেল একেবারে। কোনমতে সাইকেল চালিয়ে বাসায় এলাম। বাসায় কারো সাথে কথা বললাম না। রাতে খেলামও না। সারারাত শুয়ে শুয়ে প্ল্যান করলাম। কিভাবে বদলা নেবো, কিন্তু কোন আইডিয়াই মাথায় এলো না। পরদিন ঘুম থেকে উঠে দেখি শামীম আমার রুমে বসে আছে। শামীম আমাকে সান্তনা দিল, বলল অন্য এলাকায় প্রেম করতে গেলে এরকম মার খেতে হয়। চিন্তার কিছু নেই। তারপর আমি আর শামীম সাইকেল নিয়ে বের হলাম। পথে সোমাকে দেখলাম রিক্সায়। আমি ঐ রিক্সার একবার সামনে গেলাম, আরেকবার পেছনে। সোমা কড়া চোখে তাকাল। বিরক্ত হয়েছে মনে হলো। না দেখার ভান করে রিক্সায় বসে রইল। ওদের বাসার মোড়ে রিক্সা ঢোকার সাথে সাথে আমি থেমে গেলাম। সোমার দিকে হাত ইশারা করলাম। যেন চিঠির উত্তর দেয়, সোমা বুঝতে পারলো না কি না বুঝলাম না। আরো প্রায় ঘন্টাখানেক আমি আর শামীম মোড়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখলাম ছাদে সোমা হাঁটছে, সাথে ওর বান্ধবী। দুজন কথা বলছে, মাঝে মাঝে নীচের দিকে তাকাচ্ছে। হাসছে। আমার মনে হলো সোমা আমার দিকে তাকিয়েই হাসছে। ঠিক একই সময়ে দেখি নান্টু আসছে। ওকে ডাকলাম। কাছে এলো না। দূর থেকে ইশারায় বোঝাল চিঠি দিয়েছে। এই সময় দেখলাম এলাকার ছেলেগুলো আসছে। তাই আমি আর শামীম চলে এলাম।’

‘তারপর কি হলো?’

‘আমি আর শামীম প্রায় পালিয়ে এলাম। আর কি?’

হাতের ইশারায় চা দিতে বলেছিল রতন চায়ের দোকানদারকে। দোকানদার দু’কাপ চা এগিয়ে দিল।  

‘সোমাকে যে চিঠি দিয়েছিলে, তার উত্তর পাওনি?’

‘পেয়েছিলাম। বলছি।’ রতন বলল চায়ে চুমুক দিতে দিতে। ‘খুব অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। একটা চিঠি দিয়েছি, তার উত্তর পাই নি। এই উত্তরের উপর সব কিছু নির্ভর করছে। ঐ এলাকায় গেলেই ছেলেগুলো তেড়ে আসে। কি করবো ভাবছিলাম। তখন একদিন নান্টু আমাকে ছোট একটা কাগজের টুকরো বের করে দেবে। খুব টেনশন হচ্ছিল। গলা শুকিয়ে গিয়েছিল। কী লেখা আছে এই কাগজে। দ্রুত বাসায় এসে লেখাটা পড়লাম,’ রতন বলল।

শার্টের পকেট থেকে ছোট একটা ভাঁজ করা কাগজ ভদ্রলোকের হাতে দিলো রতন।

‘নিন, পড়ে দেখুন।’

ভদ্রলোক শব্দ করে পড়তে শুরু করলেন, ‘প্রিয় রতন, তোমার লেখা চিঠিটা অনেক বার পড়েছি। পড়েছি আর ভেবেছি। আমি কি করবো? তুমি তো জানো না, আমার পরিবারের লোকজন কতো কঠিন। সত্যিই কি তুমি আমাকে ভালোবাসো? যদি সত্যিই ভালোবাসো, তাহলে কাল বিকেলে ঠিক চারটার সময় আমি ছাদে থাকবো, তুমি আসবে। নীল রঙা শার্টটাতে তোমাকে খুব মানায়। ভালো থেকো, সোমা।’ পড়া থামালেন ভদ্রলোক। রতনের কাঁধে হাত রাখলেন, ‘বাহ! এক চিঠিতেই পটিয়ে ফেলেছিলে সোমাকে। তারপর?’

‘চিঠিটা পড়েই ভাবলাম, সত্যিই তো, ওর পরিবারের লোকজন সম্পর্কে কোন ধারনা নেই। তবে এবার আমাকে সাহস দেখাতেই হবে। এর কোন বিকল্প নেই। পরদিন আমি আর শামীম হাজির হলাম ঐ চাররাস্তার মোড়ে। আমি নীল রঙা শার্টটা পড়েছিলাম সেদিন। ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলাম, চারটার দিকে ছাদের গেটে সোমা আর ওর বান্ধবীকে দেখা গেল। আবার এই সময় পাড়ার ছেলেগুলোকেও দেখলাম এদিকে আসছে। ওরা রীতিমতো দৌড়ে এলো আমাদের দিকে। আমার কলার চেপে ধরল। ভাগ্য ভালো, এলাকার এক বয়স্ক লোক এগিয়ে এলো। তাতে অবশ্য খুব একটা লাভ হলো না। উনিও ছেলেদের পক্ষ নিলেন। বললেন মোড়ে অযথাই যেন না দাঁড়িয়ে থাকি। উনার সাথে তর্ক করা সম্ভব না। উনি ঐ এলাকায় কমিশনার। সবাই উনাকে চেনেন। আর বোঝেনই তো, মুরুব্বি মানুষ।’

‘আচ্ছা।’

‘উনার আরেকটা পরিচয় তখন জানা ছিল না।’

‘কি সেটা?’

‘উনি সোমার বাবা।’

‘ইন্টারেস্টিং। তারপর কি হলো?’

‘এরপর দিন পড়া শেষে আমি আর শামীম দাঁড়িয়ে আছি। সোমা বেরিয়ে এলো। আমার দিকে তাকাল একঝলক। তারপর ওর বান্ধবীর সাথে চলে গেল।’

‘শুধু তাকাল, আর কিছু না?’

‘না। আসলে আমিও সরাসরি কথা বলার মতো সাহস করতে পারিনি। ওর কাছাকাছি হলেই আমার হার্টবিট বেড়ে যেত। সাহস কমে যেত। শামীম খুব টিটকিরি মারতো। সেদিন রাতে বসে আরেকটা চিঠি লিখলাম। বেশ বড় করে। লিখলাম যে সেদিন নীল শার্ট পরে গিয়েছিলাম। কিন্তু বেশিক্ষন থাকতে পারিনি। আমি সবসময় তার কথা ভাবি। এতো বেশি ভাবি, মনে হয় আমার এই জীবনে সোমা ছাড়া আর কিছু নেই। এরকম আরো অনেক আবেগি কথাবার্তা। এই চিঠিটা কিভাবে পাঠাবো সেই চিন্তা করছিলাম। কারন ঐ চাররাস্তার মোড়ে গেলেই গন্ডগোল লেগে যাচ্ছে। নান্টুর কাছে কিভাবে চিঠি পাঠাবো ভাবছিলাম। খুব সহজ সমাধান পেয়ে গেলাম পরদিন সকালে। ঐ পাড়ার কিছু ছেলেকে আমাদের পাড়ার ছেলেরা আটকে রেখেছে। ওদের একজন আমাদের পাড়ায় আসে, আসমা নামের একটা মেয়েকে দেখার জন্য। আমি ওকে ছেড়ে দিলাম। শর্ত একটাই, আমাকে বিরক্ত করা যাবে না। ওরা সেই শর্তে রাজি হলো। ওদের ছেড়ে দিলাম।’

‘বাহ!তোমার তো বেশ ভাল বুদ্ধি। এভাবে শায়েস্তা করলে ওদের?’

‘এছাড়া আর কোন পথ ছিল না।’

‘তারপর?’

‘ঐদিন বিকেলে বুক ফুলিয়ে আমি আর শামীম চলে গেলাম ঐ চাররাস্তার মোড়ে। গিয়ে দেখি ওরা একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দিকে তাকিয়েও দেখছে না। এই সময় নান্টু এলো। ছোট একটা চিঠি নান্টুর হাতে গুঁজে দিলাম। নান্টু হাসতে হাসতে চলে গেল। নান্টুর হাতে চিঠি দেয়ার পর সেরাতে আমার আর ঘুম হলো না। পরদিন পড়াও ছিল না। আমি একাই চলে গেলাম সেই চাররাস্তার মোড়ে। এইসময় নান্টুকে দেখা গেল আসতে। ওর কাছ থেকে চিঠি পেলাম। ছাদের দিকে তাকিয়ে দেখলাম সোমা নেই। শুধু ওর বান্ধবী একা একা হাঁটছে। চিঠিটা হাতে পেয়েই অস্থির হয়ে বাসায় চলে এলাম। দরজা বন্ধ করে চিঠি খুললাম। ওর হাতে লেখা খুব সুন্দর। এই চিঠিটাও আছে আমার কাছে পড়বেন?’

‘পড়বো? দাও। আহ! কতোদিন পর?’

রতন ম্যানিব্যাগ বের করে ভাঁজ করা কাগজের টুকরো এগিয়ে দিল ভদ্রলোকের দিকে। তিনি পড়তে শুরু করলেন, ‘ প্রিয় রতন, আমরা দুজন দুই মেরুর বাসিন্দা। তবু তুমি আমাকে ভালোবাসো। আর আমিও তোমাকে। জানি না, পরিবার কিভাবে মেনে নেবে? তুমি তো জানো না, আমার বাবা কতো রাগি মানুষ। এরমধ্যেই আমার বিয়ের কথাবার্তা শুরু হয়ে গেছে। ছেলেপক্ষ দেখেও গেছে। ছেলে ইঞ্জিনিয়ার। জানি না কি হবে? তুমি এখনও পড়াশোনা শেষ করো নি, আমারও একই অবস্থা। এরমধ্যে আমাদের এই সম্পর্কের পরিনতি কি? আমি জানি না কিছু। আমি শুধু জানি, দিনরাত আমিও শুধু তোমাকেই ভাবি। ভালো থেকো, তোমার সোমা।’

চিঠি পড়া শেষে তাকালেন রতনের দিকে। ‘এতো কঠিন অবস্থা! প্রেমের শুরুতেই গন্ডগোল।’

‘তাহলে বোঝেন! প্রেমিকার বিয়ে ঠিক হয়ে গেলে কার মাথা ঠিক থাকে!’

‘হু। তুমি আবার ছাত্র, আয়-রোজগারের কোন ব্যবস্থা নেই।’

‘বাবা চাকরি করেন। যে কোন সময় অবসরে যাবেন। আমি সংসারে বড় ছেলে। হুট করে কিছু করতে যাওয়া তো সবার পক্ষে সম্ভব নয়, তাই না?’

‘আচ্ছা। তুমি কি উত্তর দিলে?’

‘এই চিঠি পড়ে আমার রাতের ঘুম চলে গেল। সারারাত পায়চারি করলাম রুমে। তারপর একটা চিঠি লিখলাম। সেখানে লিখলাম যতো বাঁধাই আসুক, আমি তাকেই চাই। প্রয়োজনে দূরে কোথাও চলে যাবো। যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। সব কিছু নতুন করে শুরু করবো। জানি এতো ঝুঁকি আছে। তবে ভালোবাসার মানুষকে কাছে পাওয়ার জন্য এটুকু ঝুঁকি তো নিতেই হবে। আশা করি, আমাদের ভালোবাসা সফল হবে। এখন তার উপর সব নির্ভর করছে। পরদিন সকালে নান্টুর জন্য একটা ক্রিকেট ব্যাট কিনলাম। ওকে কথা দিয়েছিলাম। ব্যাট নিয়ে চলে গেলাম ঐ চাররাস্তার মোড়ে। এই সময় সোমা আর ওর বান্ধবীকে দেখলাম দূরে। ওরা দুজনেই আমার দিকে আসছিল তখন সোমার বাবাকে দেখলাম হেটে হাসছেন। তাকে দেখে মেয়ে দুটো আবার অন্যদিকে ঘুরে গেল। আমিও অন্যদিকে তাকালাম। এই প্রথম মনে হচ্ছিল সোমার সাথে কথা হবে। কিন্তু ওর বাবা সব ভন্ডুল করে দিল। উনাকে দেখে সোমা বাসার দিকে চলে গেল। আমি ব্যাট নিয়ে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে রইলাম। নান্টু এলো। ব্যাট পেয়ে দারুন খুশি হলো। ওর হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলাম। সোমাকে দেয়ার জন্য। এরমধ্যে পাড়ার তিনটা ছেলে এসে হাজির। ওরা শুধু বলল, আমি শুধু শুধু কষ্ট করছি। সোমা’দির বিয়ে ঠিক। গতরাতে পাত্রপক্ষ আসছিল। ওরা পাড়ার ছেলে, তাই জানে। এমনকি আমাকে পরামর্শও দিল, সোমাকে নিয়ে যেন পালিয়ে যাই। নইলে নাকি আফসোস থাকবে সারাজীবন। শুরুতেই এতো ঝামেলায় পড়ে যাবো বুঝতে পারিনি। সোমার বিয়ে হয়ে গেলে আমার কি হবে? সোমার বাবা এই এলাকার কমিশনার। বেশ দাপট আছে। উনি আমার সাথে সোমাকে মেনে নেবেন না। আমি এখনও পড়াশোনাই শেষ করিনি।’

‘দাঁড়াও, তুমি কি সত্যি সত্যি পালানোর প্ল্যান করেছিলে?’

‘এছাড়া আর কোন উপায় আছে?’

‘তা ঠিক।’

‘দাঁড়ান, আরেকটা সিগারেট ধরাই।’

‘এই অভ্যাস তুমি কিন্তু আর ছাড়তে পারবে না।’

‘আরে না! এইটা কোন ব্যাপারই না।

‘আমি তো জানি।’

‘বাসায় ফিরে আমি আরো অস্থির হয়ে পড়লাম। সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। পুরো শহরটা ঘুরে বেড়ালাম। রাতে ফিরলাম বাসায়। পড়াশোনা সব শিকেয় উঠল। পরদিন ক্লাসে গেলাম। গিয়ে দেখি সোমা আসে নি। এমনকি ওর বান্ধবীটা না। আবার সেই রাস্তার মোড়ে। চুপচাপ তাকিয়ে আছি চারতলা ছাদের দিকে। হঠাৎ কাঁধে হাত পড়ল। ঘুরে তাকালাম। দেখি…সোমার বাবা। উনি ঠান্ডা গলায় আমাকে হুমকি দিলেন। আমি চলে এলাম। বুঝতে পারছি খুব ঝামেলায় পড়েছি। আমার চিঠির উত্তর সোমা দিয়েছে কি না জানি না। একমাত্র নান্টুই জানে। ওকে কোথাও দেখলাম না। আমি সোমার বাবা চলে যাওয়ার পর কাছাকাছি একটা জায়গায় এসে দাঁড়াই। এই সময় নান্টুর দেখা পেলাম। ওর কাছ থেকে চিঠিও পেলাম। সেখানে লেখা ছিল, তোমার চিঠি পড়ে সাহস পেলাম। পাত্রপক্ষ আমাকে দেখে গেছে। যেকোন দিন বিয়ের তারিখ ঠিক হবে। আমি আর পারছি না। আমি তোমার সাথে দূরে কোথাও চলে যেতে রাজি। অনেক দূরে। তুমি কি চিন্তা করছো জানাও। ইতি, সোমা।     চিঠি পড়েই আমি বুঝে গেলাম এবার আমাকে সাহসী হতে হবে। সাথে কাগজ কলম ছিল, দ্রুত চিঠি লিখে ফেললাম।’

‘তুমি কি লিখলে?’

‘পরের দিন সন্ধ্যায় রেলস্টেশনে চলে আসতে বললাম। আমরা ঢাকা চলে যাবো। সেখানে এক আত্মীয়ের বাসায় উঠবো। তারপর যা হবে দেখা যাবে।’

‘তোমার তো অনেক সাহস!’

‘সাহসী না হলে হবে?’

‘তাই তো! ঠিক বলেছো।’

‘বাসায় গিয়ে কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিলাম। টিউশনির কিছু টাকা জমিয়েছিলাম। সেগুলো নিলাম সাথে। শামীমের কাছ থেকে কিছু টাকা ধার নিলাম। সারাদিন দারুন টেনশনে কাটল। বিকেলে কাউকে কিছু না বলে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে স্টেশনে চলে এলাম।’

‘মানে আজ বিকেলে?’

‘জ্বি।’

‘তোমার ব্যাগ কোথায়?’

‘এই তো।’ বলে কাঁধে ঝোলান ছোট একটা ব্যাগ দেখাল রতন।

‘তোমার গল্প তো শেষ প্রায়। এখন গন্ডগোলটা কি হলো?’

‘গন্ডগোল বললেও কম হয়ে যায়।’

‘কি রকম?’

‘আমি বিকেল থেকে স্টেশনে এসে বসে আছি। কিন্তু সোমার খবর নেই। ওর আসার কথা সন্ধ্যা ছয়টায়। তারপর সন্ধ্যার একটু আগে আগে আমি ওকে দেখলাম। ওকে দেখে আমার পৃথিবী থেমে গেল। তখন সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বিকেলের শেষ আলোয় ওকে দেখলাম। এই দৃশ্য দেখার জন্য আমি তৈরি ছিলাম না।’

‘কি এমন দৃশ্য দেখলে?’

‘যা আপনি দেখেছেন গল্পের শুরুতে।’

রতন হাত দিয়ে সালোয়ার-কামিজ পড়া মেয়েটাকে দেখাল। মেয়েটা অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে।

‘এই তো সোমা। তাহলে গন্ডগোলটা কোথায়?’

‘এখানেই গন্ডগোল।’ 

‘তুমি অনেক হেঁয়ালি করছো।’

‘জীবন আমার সাথে হেঁয়ালি করেছে।’

‘মানে।’

‘এই মেয়েটার নাম সোমা। তবে নুরুন্নাহার সোমা নয়। সোমা মুখার্জি।’

‘মানে?’

সালোয়ার-কামিজ পরা মেয়েটা এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ভদ্রলোক তাকালেন মেয়েটার দিকে।

‘এই মেয়েটা সোমার বান্ধবী। যে সবসময় সোমার সাথে থাকতো। এমনকি ও থাকতো ঐ একই চারতলা বাড়িতে।’

‘কি বলছো? এরকম হয় নাকি?’

‘হয়েছে তো। নান্টু যখন বলতো, সোমাদি, তখনও বুঝিনি। এই মেয়েটা চারতলার ছাদে থাকতো সোমার সাথে। এমনকি ক্লাসেও ছিল সোমার পাশে। নান্টুর কাছে যখন চিঠি দিয়েছি, সেই চিঠি গিয়েছে এই সোমার কাছে। আমি যাকে ভালোবাসি, সে আমার কোন চিঠি পায় নি, আমিও তার কোন চিঠি পাই নি।’

‘কি অদ্ভুত!’

‘আমি এখন কি করবো?’

‘তোমার কি করা উচিত জানো?’

‘আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না। এই সোমাকে ঠিকমতো আমি দেখিইনি। ভালোবাসার প্রশ্নই আসে না।’

‘কিন্তু এই সোমা তো তোমাকে ভালোবাসে।’

‘ওহ।’

‘সে তোমাকে ভালোবেসে সব ছেড়ে চলে এসেছে।’

রতন মাথা চুলকাল।

‘সে পরিবার, সমাজ সব কিছু ছেড়ে দিয়েছে তোমার জন্য।’

‘আমার এখন কী করা উচিত?’

‘তুমি আমার পরামর্শ রাখবে?’

‘আমার মাথায় কিছু ঢুকছে না, আপনি বলুন।’

‘মনটা শক্ত করো। খুব বড় সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছো তুমি।’

‘ট্রেন যখন তখন চলে আসবে।’

‘তুমি ওকে ফিরিয়ে দিও না। ও তোমাকে যেমন ভালোবেসেছে তেমন ভালোবাসা তুমি জীবনে আর নাও পেতে পারো। আর তুমি ওকে ফিরিয়ে দিলে এই মেয়েটা কোথায় যাবে? কোন মুখে বাড়ি ফিরবে? ও যে ভালোবাসার সমুদ্র নিয়ে তোমার কাছে এসেছে, সেটা ফিরিয়ে দিলে অনেক বড় অন্যায় হবে। সেই অন্যায় মাথায় নিয়ে তুমি কিভাবে বাঁচবে?’

রতন চুপচাপ কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকল ভদ্রলোকের দিকে।

‘আমরা জীবনে আসল ভালোবাসা চিনতে ভুল করি। তারপর সারাজীবন আফসোস করতে করতে কেটে যায়। তোমার কাছে এখনও সুযোগ আছে, সব কিছু নতুন করে শুরু করার, নতুন করে ভালোবাসার।’

‘আপনি বলছেন আমি যাবো ওর কাছে!’

‘হ্যাঁ, আমি বলছি। ওর হাত ধরো। ও তোমার হাত কোনদিন ছাড়বে না।’

‘আপনি জানেন?’

‘হ্যাঁ, আমি জানি।’

রতন ব্যাগ কাঁধে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। একপলক তাকায় প্রৌঢ় ভদ্রলোকের দিকে। তারপর মেয়েটার দিকে হাঁটতে থাকল। সোমা তাকিয়ে আছে ওর দিকে, হাসিমুখে। প্রৌঢ় ভদ্রলোক তাকিয়ে আছেন রতনের যাবার পথের দিকে। হাসিমুখে। রতন গিয়ে সোমার পাশে দাঁড়াল। তার চোখের সামনে থেকেই রতন আর সোমা ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি চোখ মুছলেন। তার কাঁধে কেউ হাত রাখল। তিনি পেছনে তাকালেন। দেখলেন তার স্ত্রী দাঁড়িয়ে আছে।

সোমা মুখার্জির বয়স হয়েছে। চুল পেকেছে বেশ।

‘তুমি এখানে দাঁড়িয়ে কি বিড়বিড় করছিলে?’

‘অনেক আগের কিছু কথা মনে পড়ে গেল।’

‘তোমাকে নিয়ে আর পারি না। চলো, ট্রেন আসার সময় হলো।’

প্রৌঢ় ভদ্রলোক স্ত্রীর হাত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। কথাগুলো তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই ঘটনাটা পয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা। এই রতন আর কেউ নয়, এই প্রৌঢ় ভদ্রলোক নিজেক। সোমা মুখার্জিকে নিয়ে সেদিন এই স্টেশন থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন। জানতেন না কী হবে। গত পয়ত্রিশ বছর ভালোবাসায়, মমতায় সোমা তাকে বেঁধে রেখেছে। সেদিন সোমাকে ফিরিয়ে দিলে হয়তো জীবনটাই অন্য রকম হতো। হয়তো সত্যিকারের ভালোবাসা কোনদিনই পাওয়া হতো না। সোমাকে নিয়ে সুখে কেটেছে জীবনটা, ছেলে-মেয়েরাও সব ভালো আছে। আজ পয়ত্রিশ বছর পর পুরানো এই স্টেশনে এসে সব মনে পড়ে গেল তার। শুধু একটা সিদ্ধান্ত তাকে এই জীবন দিয়েছে। সত্যিকারের ভালোবাসাকে চেনার সিদ্ধান্ত। পয়ত্রিশ বছর আগের রতনকে পরামর্শ দেয়ার কেউ ছিল না। কিংবা হয়তো ছিল। কে জানে!  

Shariful Hasan
sharif.h.lashkar@gmail.com
2 Comments
  • Abid Hossain Joy
    Posted at 16:46h, 27 July Reply

    অসাধারণ লাগলো। প্রিয় লেখক। অনেক দিন পর আপনার লিখা পড়লাম। শেষ বার পড়েছিলাম, আঁধারের যাত্রী।
    এই গল্পটা পড়তে পড়তে আপনার সামাজিক থ্রিলারের স্বাদ পাচ্ছিলাম।
    শেষটা দারুণ।
    শুভ কামনা থাকলো।

  • Md. Shahin Alam
    Posted at 18:35h, 08 August Reply

    ভালো লেগেছে। নতুন বইয়ের আশায় থাকলাম। ভালো থাকবেন লেখক।

Post A Comment

Shopping cart0
There are no products in the cart!
Continue shopping
0